উত্তর আফ্রিকার মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি

উত্তর আফ্রিকায় সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ


উত্তর আফ্রিকার মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি কেবলমাত্র ইসলামের ইতিহাসে নয়, বরং তা ইউরোপীয় সভ্যতার বিকাশে অসামান্য অবদান রেখেছে। আইয়ুবী বংশের সুলতানগণ ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার দরুন তাদের সাংস্কৃতিক মননশীলতা দেখাতে না পারায় উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি বলতে মূলত ফাতেমি এবং মামলুক সভ্যতা ও সংস্কৃতিকেই প্রকাশ করে।

উপর্যুক্ত বংশীয় শাসকগণ জ্ঞান - বিজ্ঞান, স্থাপত্যকলা, চিত্রকলা ও চারুশিল্প, কারুশিল্প প্রভৃতিতে নিজেদের সৃজনশীল মননশীলতার স্বাক্ষর রেখে যান, যা উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে অনবদ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ফাতেমি আমলে প্রতিষ্ঠিত আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ও দারুল হিক্কা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় স্বর্ণ যুগের সূচনা করে। মূলত উত্তর আফ্রিকার সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ফাতেমি এবং মামলুক এই দুই শাসনামলেই হয়েছিল। ফাতেমি শাসনামলে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ৯০৯ খ্রি. ওবায়দুল্লাহ আল মাহদী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ফাতেমি খিলাফত ১১৭১ খ্রি. পর্যন্ত প্রায় ২৬২ বছর পর্যন্ত টিকে থেকে উত্তর আফ্রিকার সত্যতা ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধন করে।

নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা: ফাতেমি খলিফাগণ সংস্কৃতিমনা ছিলেন। বিধান ও প্রতিভাবান ব্যক্তিমাত্রই তাদের নিকট অত্যন্ত সমাদৃত হতো। খলিফাদের ন্যায় উজিররাও কবি, পণ্ডিত ও আলেমদের প্রতি সহৃদয়তা ও সদাশয়তার পরিচয় দিতেন। জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় ফাতেমি আমলের সর্বশ্রেষ্ঠ দুটি প্রতিষ্ঠান ছিল—
  • আল - আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ও
  • দারুল হিকমা
আল- বিশ্ববিদ্যালয়: খলিফা আল মুইজের সেনাপতি আল-জওহর আল-সিকিলি ফুসতাত নগরীর সন্নিকটে আল কাহেরা বা বিজয়িনী (বর্তমান কায়রো) নগরীর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করে। বর্গাকার নগরীর পূর্বদিকে খলিফার জন্য একটি বৃহৎ প্রাসাদ এবং পশ্চিম প্রান্তে ক্ষুদ্র প্রাসাদ নির্মিত হয়। খলিফার প্রাসাদের উত্তরে উজিরের দফতরখানা ও দক্ষিণে আল আজহার মসজিদ স্থাপিত হয়। আল আযহারের নির্মাণ কাজ ৯৭০ খ্রি. শুরু হয় এবং ৯৭২ খ্রি. সমাপ্ত হয়। জওহর আল সিকিলি বিবি ফাতেমার স্মরণার্থে আল আযহার নামে যে মসজিদ নির্মাণ করেন সেখানে পরবর্তীকালে খলিফা আল আজিজের রাজত্বকালে একটি গ্রন্থাগার স্থাপিত হয় এবং এটি তৎকালীন বিশ্বে সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে।

খলিফা আল হাকিম জ্ঞানানুশীলনের নিমিত্তে ১০০৫ খ্রি. খলিফা আল মামুনের “বায়তুল হিকমার” অনুরূপ “দারুল হিকমা” (জ্ঞানভবন) নামে এক বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। শিয়া মতবাদ প্রচার এর প্রধান উদ্দেশ্য হলেও কবিতা, তুলনামূলক আইন, ব্যাকরণ, সমালোচনা, আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা, শব্দ বিজ্ঞান প্রভৃতিও এখানে শিক্ষা দেয়া হতো। ফিকহ, কুরআন-হাদিস, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য স্বতন্ত্র অধ্যাপক নিযুক্ত হতেন। এর সাথে একটি চমৎকার গ্রন্থাগার সংযুক্ত ছিল। খলিফা প্রখ্যাত দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ইবনে হায়সামকে দারুলউত্তর আফ্রিকায় কাতেমি খিলাফত ১০ হিফয়ার অ্যাপারকে সমৃশ্য করেন। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সপ্তাহ এবং নতুন ফ্ল্য প্রণয়ন উভয় কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কিয়ার কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করার দায়িত্বে নিয়োগ করেন। তিনি প্রায় ১০০ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং মাতুল দেন। প্রায় ১৮ বছর পর এটি পুনরায় খুলে দেয়া হয় । করার ফলে মাতুল হিকমা নাড়ে। আল মামুনের বায়তুল হিকমার ন্যায় প্রসিদ্ধি অর্জন করে। জ্ঞানভবন ১০০ বছর পর্যন্ত জগতে জ্ঞান বিকিরণ করার পর ধর্মবিরোধী মত প্রচারের অপরাধে ১১১৯ খ্রি. উজির আল আকদাস এটি বন্ধ করে।

সাহিত্যচর্চা

ফাতেমাদের জ্ঞান - তৃষ্ণা ও বিদ্যোৎসাহিতা বাস্তবিকই শুদ্ধার উদ্রেক করে। খণিফাদের বিরাট কুতুবখান আরবদের পরিজ্ঞাত জ্ঞানের সর্ব শাখা ও সাহিত্যের লক্ষাধিক পুস্তক সংগৃহীত হয়। পাণ্ডুলিপির মধ্যে ইবনে মুকলা ও অন্যান্য হস্তলিপি বিশারদদের লিখিত ২৪০০ কুরআন, ৩০ টি বিরাট আরবি অভিধান ও ইবনে দুবায়দের ১০০ টি জামহারা ছিল।
কবি ইবনে খাল্লাসকে “মিশরের চক্ষুমণি” ও স্বদেশের সমস্ত মহৎ গুণের প্রতীক বলে অভিহিত করা হয়েছে। তিনি ছিলেন হাফেজের আমলে বার্তা বিভাগের অধ্যক্ষ। কাজী অর--রশীদ, ইবনে জুবায়ের কবি ও পন্ডিত তার পুত্র ও পৌত্ররাই প্রাথমিক ফাতেমি আমলে সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ছিলেন। হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। উজির ইবনে সাল্লাবের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল।

চিকিৎসা

প্রকৃতপক্ষে, কাজী আল নোমান এবং চিকিৎসাশাস্ত্র খলিফা মুইজ চিকিৎসাবিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান চর্চায় বিশেষ উৎসাহ দিতেন। তিনি ইহুদি চিকিৎসক মূল্য বিন-আল সাজ্জানকে দুই পুত্রসহ চাকরিতে নিযুক্ত করেন। পিতাপুত্র তিনজনই চিকিৎসক মহলে প্রামাণ্য বলে গৃহীত হন। আলেকজান্দ্রিয়ায় সায়দ বিন বাত্রিক ছিলেন আর একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক (১৪৩)। অপরদিকে চশমা আবিষ্কারের জন্য দৃষ্টিশক্তি হ্রাসপ্রাপ্ত ব্যক্তিমাত্রই ইবনে হায়সামের নিকট ঋণী।

কারুশিল্প

নির্মাতা হিসেবে ফাতেমি খলিফা ও উজিরদের খ্যাতি ছিল। আল আযহার ও হাকিমের মসজিদ তাঁদের স্থাপত্য সাধনার সাক্ষ্যরূপে অদ্যাপি বিদ্যমান আছে। সাধারণত পারস্যে অশ্বক্ষুরাকৃতি খিলানের উদ্ভব হলেও মিশরীয় মুসলমানেরা এর উৎকর্ষ সাধন করেন। ফাতেমি শিল্পীদের সর্বাপেক্ষা অভিনব প্রবর্তন হলো Stalactite: pendentive গঠনকারী খিলান। এডেসার শিল্পীদের নির্মিত কায়রোর বাবলু নসরু, বাবলু সুভূহ ও বাবলু থুবায়দা নামক তিনটি বিরাট তোরণ ফাতেমিদের সর্বাপেক্ষা স্বায়ী নিদর্শনরাজির অন্যতম।

চিত্রকলা

সুন্নি শিল্পীরা সাধারণত জীবন্ত প্রাণীর চিত্র অঙ্কন করতেন না, কিন্তু শিয়ারা তাতে কুণ্ঠাবোধ করতো না। আশ ফাসিব ও ইবনে আজিজ নামক দুজন প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানি চিত্রকর উজির আল আদুরির অধীনে কাজ করতো। তাদের জন তার জন্য কৃষ্ণবর্ণ খিলানের মধ্যে প্রস্থানোদ্যতা শ্বেতবাস পরিহিতা এক নর্তকী বালিকার ও দ্বিতীয়জন শার্শ্ববর্তী পীতবর্ণের খিদানের মধ্যে বহির্গমনোন্মুখ লোহিত বস্ত্র পরিহিতা এক কিশোরীর চিত্র অঙ্কন করেন। কারুশিল্প ও আলবার্ট মিউজিয়ামে ৯৭০ খ্রি. লিখিত যে গজদন্তের বাক্স পাওয়া যায় তা সম্ভবত ফাতেনি কারিকার ফাতেমি শিল্পীরা রেশমী কাপড়, বুটিদার বজ্র, মখমল ও অন্যান্য কাপড়ের মধ্যে স্বর্ণসূতা যারা বহন করতেন। মিশরে তৎকালীন তাঁতের বজ্রও বেশ বিখ্যাত ছিল। খলিফা জহিরের তাঁবু বিশৃদ্ধ বর্ণসূতা দ্বারা নির্মিত এবং না হারী রৌপ্য সতষ্কের উপর স্থাপিত হতো।

মামলুক শাসনামল


সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ মামলুক জগতের অতি অল্প রাজবংশই উত্তর আফ্রিকার মামলুক সুলতানদের ন্যায় খ্যাতিলাভে সমর্থ হয়েছে।

মামলুক সুলতানগণ দুইভাগে তাদের শাসন পরিচালনা করেছেন। যথা—
  • বাহরী মামলুক ও
  • বুরজী মামলুক
সুলতানা শাজারউদ্দার কর্তৃক ১২৫০ খ্রি. প্রতিষ্ঠিত এ বংশ ওসমানীয় সুলতান সেলিমের নিকট ১৫১৭ খ্রি. তুমান বে এর পরাজয়ের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ ২৬৭ বছর রাজত্ব পরিচালনা করে উত্তর আফ্রিকায় সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে এক অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের সাহিত্যচর্চা

মামলুক সুলতানগণ মোকালসের আক্রমণ প্রতিহত করে মিশর ও সিরিয়াকে শুধু মাংসের হাতে থেকে রক্ষা করেন। সংস্কৃতির ধারা অব্যাহত রাখেন। শামসউদ্দীন আহমদ ইবন মুহাম্মদ ইবন খাগ্নিকান তার প্রখ্যাত প্রশ্ন ফাইয়াত উল আইন যান ওয়া আলবা আবনা উচ্চ আমান রচনা করে যশস্বী হন। এই মূল্যবান প্রদে ইসলামের ইতিহাসের ১৬ জন জ্ঞানী গুণী ব্যক্তির জীবনী সংকলিত আছে। নিকলসন একে সর্বোৎকৃষ্ট লিখিত জীবনী ফ্লশ হিসেবে মত প্রকাশ করেন।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের ইতিহাস

ইতিহাস রচনায় মামলুক যুগ খুবই প্রসিদ্য ছিল। কারণ এই সময় ইসলামের কতিপয় খ্যাতনামা ঐতিহাসিক, যেমন আবুল ফিদা, ইবন ভাগরি বিরণি, আল মুহূতি এবং আল মাকরিযির আবির্ভাব হয়। আবুল ফিদা, মুক্তাতামার তারিখ - টল বাশার ( মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রচনা করেন। জামালউদ্দিন আল সুয়ুতি একাধারে কুরআন, হাদিস, আইন, ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে বহু প্রশ্ন রচনা করেন। আল মাকরিযি নিঃসন্দেহে মামলুক যুগের সর্বাধিক খ্যাতিসম্পন্ন ঐতিহাসিক ছিলেন। বিশ্বকোষ রচনায়ও মামলুক যুগ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। এই সময়ের দুজন খ্যাতনামা বিশ্বকোষ প্রণেতা ছিলেন আহমদ লৈ নুওয়াইবী এবং আহমদ উল কালকাশালী।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের চিকিৎসা বিজ্ঞান

দামেস্কে কালাউন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকাকালীন নুরুদ্দীনের হাসপাতালের অনুকরণে কায়রোতে একটি  ‘মারিস্তান’ (হাসপাতাল) নির্মাণের পরিকল্পনা করেন যা পরে বাস্তবায়িত হয়। আল নাসিরের রাজত্বকালে রাজকীয় অশ্বশানার অধ্যক্ষ আবু বকর ইবন আল মুনজির আল বাইতা পশু চিকিৎসার উপর একটি তথ্য সম্বলিত গ্রন্থ রচনা করেন। কালাউনের মানসুরিয়া একাডেমির অধ্যক্ষ আবুল মুমিন আল দিমিয়াতী ফজল-টল-খাইন (অশ্বের উৎকর্ষ) নামক প্রশ্ন প্রণয়ন করেন।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের স্থাপত্যকলা

মামলুক স্থাপত্যশিল্প মিশরের সারাসেনিক শিল্পের ইতিহাসে সম্ভবত সর্বাপেক্ষা সৌন্দর্যমণ্ডিত। বায়বার্গ একটি জামে মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণ করেন। কালাউনের হাসপাতাল তৎকালীন যুগে একটি অপূর্বসুন্দর স্থাপত্যকীর্তি ছিল।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের চিত্রকলা

মামলুক প্রতিকৃতিগুলো ছিল অনঢ় ও পুতুলের মতো নিস্পৃহ। কিন্তু উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে এর চিত্রাবলি ম্যাডিসের নক্সা পরিকল্পনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ভিয়েনায় রক্ষিত ১৯৩২ খ্রি. চিত্রিত মাঝামাতের একাধিক পাণ্ডুলিপির চিত্রাবলি মামলুক স্কুলে চিত্রিত মিনিয়েচারসমূহের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ।

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের কারুশিল্প

কারুশিল্পে মামলুক কারিগরগণ অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করেন। প্যারিসের লুভ্যর মিউজিয়ামে রক্ষিত তথাকথিত সেন্ট লুই এর খ্রিস্ট ধর্মাহ বিষয়ে খোদিত তামার আধারটি মামলুকদের রাজত্বে ১২৯০-১৩১০ খ্রি. মিশরে নির্মিত হয়। ফাতেমি আমলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্ঞানপিপাসু তাদের জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণের জন্য আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় ও দারুল হিকমায় গমন করতো। জ্ঞান - বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ফাতেমিদের মতো মামলুকগণও সমান প্রভাব বিস্তার করে যা উত্তর আফ্রিকায় সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হয়।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url